NGO Loan

দিশা এনজিও লোন ২০২৬ কিভাবে পাবেন, কত টাকা মিলবে ও শর্তাবলী

আপনি কি ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান? নাকি কৃষি কাজে মূলধন দরকার? অথবা সন্তানের পড়ার খরচ কিংবা জরুরি চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন? অনেক সময় ব্যাংকের জটিল প্রক্রিয়া ও কড়া শর্তের কারণে সাধারণ মানুষ ঋণ পেতে হিমশিম খান। সেখানেই এনজিওগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য একটি সংস্থা হচ্ছে দিশা (Development Initiative for Social Advancement)।

দিশা এনজিও লোন ২০২৬ এখন অনেকের কাছেই স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি সারা দেশে দারিদ্র্য বিমোচন, নারী ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির জন্য সুপরিচিত। কিন্তু এই লোন পেতে গেলে কী কী নিয়ম, কত টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায় এবং সুদের হার কত এসব জানা খুব জরুরি। আজকের আর্টিকেলে আমরা দিশা এনজিও লোন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাবো।

দিশা এনজিও থেকে কত টাকা লোন পাওয়া যায়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দিশা এনজিও লোন এর পরিমাণ কত হতে পারে। সাধারণত আপনার প্রয়োজন, আয়ের উৎস এবং দিশার শাখার নীতির ওপর ভিত্তি করে লোনের পরিমাণ ঠিক করা হয়। ছোট প্রয়োজন থেকে শুরু করে মাঝারি ব্যবসা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের লোন দিয়ে থাকে দিশা।

প্রচলিত লোনের ক্যাটাগরি ও পরিমাণ

লোনের ধরন অনুযায়ী টাকার পরিমাণ কমবেশি হয়। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:

  • ক্ষুদ্রঋণ: যারা ছোট পরিসরে ব্যবসা বা কৃষি কাজ করেন, তাদের জন্য এই লোন। সাধারণত ৫,০০০ টাকা থেকে ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
  • বিশেষ ঋণ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা স্যানিটেশনের মতো বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে এই ঋণ। এখানে লোনের পরিমাণ ১৫,০০০ টাকা থেকে ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
  • এমএসএমই ঋণ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই লোন। এটি তুলনামূলক বড় অঙ্কের হয়ে থাকে। ২,০০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার সুযোগ আছে।

মনে রাখবেন, আপনি ঠিক কত টাকা পাবেন, তা নির্ভর করে আপনার মাসিক আয়, ব্যবসার ধরন ও পূর্বের কোনো লোন পরিশোধের ইতিহাসের ওপর। প্রথমবার লোন নিলে অঙ্কটা একটু কম হতে পারে, পরে নিয়মিত কিস্তি দিলে লোনের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

দিশা এনজিও লোন নেওয়ার পদ্ধতি

অনেকেই মনে করেন এনজিও থেকে লোন নেওয়া খুব কঠিন। কিন্তু দিশার প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ ও গ্রাহকবান্ধব। আসুন, ধাপে ধাপে জেনে নিই কীভাবে দিশা এনজিও লোনের জন্য আবেদন করতে হয়।

ধাপে ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া

আপনার এলাকায় দিশার শাখা থাকলে সেখান থেকে শুরু করুন। পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে বর্ণনা করা হলো:

  1. শাখায় যোগাযোগ: আপনার নিকটস্থ দিশা এনজিওর শাখা অফিসে গিয়ে লোন সম্পর্কে খোঁজ নিন। তারা বিভিন্ন ধরনের লোনের কথা বলবেন। আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই লোন কোনটা, সেটা জেনে নিন।
  2. আবেদন ফরম সংগ্রহ ও পূরণ: শাখা থেকে আবেদন ফরম নিয়ে সঠিক তথ্য দিয়ে পূরণ করুন। নাম, ঠিকানা, বয়স, পেশা এবং লোন নেওয়ার কারণ উল্লেখ করতে হবে।
  3. কাগজপত্র জমা দেওয়া: ফরমের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন। যেমন—জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি, ঠিকানার প্রমাণ ইত্যাদি।
  4. সত্যতা যাচাই (ভেরিফিকেশন): আবেদন জমা পড়ার পর দিশার কর্মকর্তা আপনার বাড়ি বা দোকানে এসে তথ্য যাচাই করবেন। তারা আপনার কাজ ও আয়ের উৎস দেখবেন। এই ধাপটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
  5. লোন অনুমোদন ও চুক্তি: যাচাই-বাছাই শেষে আপনার আবেদন অনুমোদিত হলে দিশা অফিস থেকে আপনাকে জানানো হবে। তখন আপনাকে শর্তাবলী বুঝিয়ে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে।
  6. টাকা উত্তোলন: চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপনার লোনের টাকা বিতরণ করা হবে।

দিশা এনজিও লোনের যোগ্যতা

দিশা এনজিও লোন পেতে কিছু সাধারণ যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। নিচের শর্তগুলো থাকলে আপনার আবেদন জোরদার হবে।

  • বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
  • হতে হবে বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা।
  • থাকতে হবে নিয়মিত আয়ের উৎস। যেমন—ছোট ব্যবসা, কৃষি কাজ বা চাকরি।
  • নিম্ন আয়ের পরিবার ও নারীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
  • আগের কোনো লোন খেলাপি হলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে।
  • বড় অঙ্কের লোনের জন্য একজন গ্যারান্টারের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে চাইলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকে তৈরি রাখুন। সাধারণত নিচের ডকুমেন্টগুলো চাওয়া হয়:

  • জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি।
  • সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি (২ কপি)।
  • ঠিকানার প্রমাণপত্র (বিদ্যুৎ বিলের কপি বা ইউনিয়ন পরিষদের সনদ)।
  • আয়ের প্রমাণ (ব্যবসার কাগজ বা চাকরির সনদ)।
  • বড় লোন হলে গ্যারান্টারের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি।
  • শাখা থেকে দেওয়া পূরণকৃত আবেদন ফরম।

দিশা এনজিও লোনের সুদের হার

যেকোনো লোনের আগে সুদের হার জেনে নেওয়া জরুরি। দিশা এনজিও লোনের সুদের হার সাধারণত ১২% থেকে ১৫% এর মধ্যে হয়ে থাকে। তবে লোনের ধরন, কিস্তির মেয়াদ এবং শাখাভেদে এই হার কমবেশি হতে পারে। সুদের হার ও অন্যান্য বিষয় সহজে বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি দেখতে পারেন:

বিষয়সাধারণ ধারণা
সুদের হার১২% – ১৫% (লোন ও শাখাভেদে পরিবর্তনশীল)
লোনের মেয়াদ৬ মাস থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত হতে পারে
কিস্তি পরিশোধসাপ্তাহিক বা মাসিক, দুইভাবেই দেওয়ার সুবিধা আছে

সর্বশেষ ও সঠিক সুদের হার জানার জন্য আপনার এলাকার শাখা অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করাই ভালো।

দিশা এনজিও লোনের সুবিধা

দিশা থেকে লোন নেওয়ার কিছু বড় সুবিধা আছে, যা একে ব্যাংক লোন থেকে আলাদা করে।

  • জামানত ছাড়া লোন: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি লোনের জন্য কোনো জামানত বা বন্ধক রাখতে হয় না।
  • দ্রুত প্রক্রিয়া: ব্যাংকের তুলনায় লোন পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ও সহজ।
  • নারীদের অগ্রাধিকার: নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে দিশা বিশেষ নজর দেয়। নারীদের জন্য লোনের শর্ত অনেক ক্ষেত্রে আরও সহজ করা হয়।
  • নমনীয় কিস্তি: গ্রাহকের আয়ের সুবিধা অনুযায়ী সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
  • বহুমুখী ব্যবহার: এই লোন দিয়ে আপনি ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা বা জরুরি যেকোনো কাজে টাকা ব্যবহার করতে পারবেন।

কেন দিশা এনজিও বেছে নিবেন?

বাংলাদেশে অনেক এনজিও কাজ করে। কিন্তু দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা ও গ্রাহকবান্ধব সেবার কারণে দিশা একটি আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।

  • দীর্ঘ অভিজ্ঞতা: ১৯৯৩ সাল থেকে কাজ করছে, ফলে তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়।
  • বিস্তৃত নেটওয়ার্ক: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের শাখা রয়েছে, তাই নিজ এলাকায় গিয়েই সেবা নেওয়া যায়।
  • গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা: শাখায় গেলে কর্মকর্তারা সবকিছু বুঝিয়ে বলেন এবং সাহায্য করেন।
  • সামাজিক উন্নয়ন: শুধু লোন দিয়েই থামে না দিশা, তারা গ্রাহকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা মূলক কার্যক্রমও চালায়।

প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

দিশা এনজিও লোন পেতে কতদিন সময় লাগে?

কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে যাচাই-বাছাই শেষে খুব দ্রুত, সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে লোন ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শাখার কাজের চাপের ওপর ভিত্তি করে সময়টা কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

দিশা এনজিও লোন নিতে কি জামানত লাগে?

ছোট অঙ্কের সাধারণ লোনের জন্য জামানত লাগে না। তবে আপনি যদি বড় অঙ্কের লোন নিতে চান, সেক্ষেত্রে একজন গ্যারান্টারের প্রয়োজন হতে পারে।

আগে লোন নিলে আবার কি নতুন করে লোন পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, পাওয়া যায়। আপনি যদি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন এবং লোনের টাকা সঠিক কাজে লাগান, তাহলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় অঙ্কের লোন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দিশা এনজিও লোনের সুদের হার কি সবার জন্য সমান?

না, লোনের ধরণ ও মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে সুদের হার ভিন্ন হতে পারে। আবেদনের সময় শাখা অফিস থেকে বিস্তারিত জেনে নেওয়াই ভালো।

শেষ কথা

দিশা এনজিও লোন ২০২৬ হতে পারে আপনার ছোট স্বপ্নকে বড় করে তোলার একটি সোপান। ব্যবসা শুরু করা, কৃষিতে বিনিয়োগ করা বা শিক্ষার খরচ চালানো সব ক্ষেত্রেই এই লোন একটি বাস্তব সমাধান দিতে পারে। তবে ঋণ যেন মাথাব্যথার কারণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা বুঝে তবেই লোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন। আপনি যদি দিশা এনজিও লোন নিতে আগ্রহী হন তাহলে দেরি না করে আপনার নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করুন ও সবকিছু বিস্তারিত জেনে এগিয়ে যান। সঠিক পরিকল্পনা আর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে আপনি আপনার আর্থিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button